রহস্যময় সৌরজগত ও আমাদের পৃথিবী

সৌরজগৎ হল সূর্য ও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্য-প্রদক্ষিণকারী তথা পরস্পরের প্রতি অভিকর্ষজ টানে আবদ্ধ মহাজাগতিক বস্তুগুলিকে নিয়ে গড়ে একটি ব্যবস্থা। আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রস্থল থেকে ২৬,০০০ আলোকবর্ষ দূরে কালপুরুষ বাহুতে এই গ্রহ ব্যবস্থাটি অবস্থিত। সৌরজগতে প্রত্যক্ষভাবে সূর্য-প্রদক্ষিণকারী বস্তুগুলির মধ্যে আটটি গ্রহই বৃহত্তম। অন্য ক্ষুদ্রতর বস্তুগুলির মধ্যে রয়েছে বামন গ্রহ ও সৌরজগতের ক্ষুদ্র বস্তুসমূহ। পরোক্ষভাবে সূর্য-প্রদক্ষিণকারী বস্তুগুলির মধ্যে দু’টি প্রাকৃতিক উপগ্রহ ক্ষুদ্রতম গ্রহ বুধের থেকেও আকারে বড়ো।
আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য। সূর্য অন্যান্য নক্ষত্রের মতো জ্বলন্তএকটি গ্যাসপিন্ড। এই জ্বলন্ত গ্যাসপিন্ডে রয়েছে মূলতঃ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস। হাইড্রোজেন গ্যাসের পরমাণু পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। এ শক্তি তাপ ও আলোকশক্তি হিসেবে সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই সূর্যের কাছ থেকে আমরা তাপ ও আলো পেয়ে থাকি।
সূর্য মাঝারি আকারের একটি নক্ষত্র। তারপরও এটি পৃথিবীর তুলনায় লক্ষ লক্ষ গুণ বড়। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তাই পৃথিবী থেকে আমরা সূর্যকে এত ছোট দেখি। গ্রহরা হলো পাথর অথবা গ্যাসের বড় গোলক। তারা নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরে। আমরা এমনি একটি গ্রহে বাস করি। এটিকে আমরা সবাই পৃথিবী বলি। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে। এছাড়াও সৌরজগতে আরও সাতটি গ্রহ এবং প্রচুর ছোট ছোট জিনিস সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে।
হাজার বছর আগে, অ্যারিস্টোকাস নামের একজন লোক বলেছিলেন যে, আমাদের সৌরজগতের সকল কিছু সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে। কিছু লোক তার কথা বিশ্বাস করেছিলো, কিন্তু অনেকেই সেটা করেনি। যারা বিশ্বাস করেনি তারা মনে করতো সূর্যসহ (এমনকি অন্যান্য নক্ষত্রেরাও) সৌরজগতের সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়, কারণ পৃথিবীকে দেখে মনে হয় না এটি তার জায়গা থেকে নড়ছে অথবা ঘুরছে, তাই না?
প্রায় ৫০০ বছর আগে কোপারনিকাস নামের আরেকজন লোক অ্যারিস্ট্রোকাসের মত একই কথা বললেন। তিনিও বললেন সকল গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এবার আরও বেশি লোকজন তার কথা সমর্থন করলো, কিন্তু তখনও অনেকেই তার কথা বিশ্বাস করলো না। এর প্রায় ১০০ বছর পর গ্যালিলিও গ্যালিলি নামের এক ব্যক্তি টেলিস্কোপ নামক এক নতুন জিনিস দিয়ে আকাশের দিকে লক্ষ্য করা শুরু করলেন। তিনিও বললেন সকল গ্রহই সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। এবার আরও অনেক বেশি মানুষ তার কথা বিশ্বাস করলো এবং তারা ভাবলো গ্যালিলিও হয়তো ঠিকই বলছেন এবং পৃথিবী সত্যিই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। শীঘ্রই আরও অনেক লোক টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ দেখা শুরু করলো। যদিও তখন এমনও মানুষ ছিলো যারা মনে করতো গ্যালিলিও ভুল কথা বলছেন। এজন্য তাকে মিথ্যা বলার অপরাধে গ্রেফতার করে বিচারের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। যেসব লোক তার কথা বিশ্বাস করেছিল তারা বুঝতে শুরু করলো যে গ্রহরা এবং সৌরজগতের অন্য জিনিসগুলো কিভাবে নিজেদের স্থান পরিবর্তন করছে, যাতে তারা প্রমাণ করতে পারবে যে গ্যালিলিও মিথ্যা কথা বলছেন না। অ্যারিস্ট্রোকাসের মৃত্যুর বহু বহু বছর পর লোকজন অবশেষে বললো, “ঠিক আছে, পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে”। গ্যালিলিওকে আর তখন কেউ মিথ্যাবাদী বললো না।
সৌরজগতের গ্রহসমূহ
সূর্যকে কেন্দ্র করে যে সকল বিশালাকার মহাকাশীয় গোলক ঘুরে চলেছে, সে সকল গোলককে সাধারণভাবে গ্রহ নামে অভিহিত করা হয়। সূর্যের নিকট থেকে বিভিন্ন দূরত্বে এই গ্রহগুলো অবস্থান করছে। প্রকৃতপক্ষে সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে এখনো নিরূপিত হয় না। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রহের সংজ্ঞানুসারে কিছু গ্রহকে বামনগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সেই বিচারে প্লুটোকে এখন আর প্রধান গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। ছোটো বড় এবং গঠনিক উপাদান বিচার করে গ্রহগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগগুলো হলো–
পৃথিবীসদৃশ-গ্রহ (terrestrial planets)
সূর্য থেকে পর চারটি গ্রহকে এই নামে অভিহিত করা হয়। এই গ্রহগুলোর গাঠনিক উপাদান পাথর ও বিভিন্ন ধরনের ধাতব পদার্থ। এই গ্রহ চারটি হলো– বুধ, শুক্র, পৃথিবী, এবং মঙ্গল।
গ্যাসীয় দানব-গ্রহ (Jovian planet, gas giant)
মঙ্গল গ্রহের পরে ৪টি বিশালাকার গ্রহ রয়েছে। এই গ্রহ দুটির প্রধান উপাদান জমাটবদ্ধ গ্যাস। এই গ্যাসপিণ্ডের প্রধান অংশ হিসাবে আছে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, মিথেন, এ্যামোনিয়া । এই ৪টি গ্রহ হলো– বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন।
বামন গ্রহ (dwarf planet)
গ্রহের তৃতীয় সূত্রানুসারে, প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে কিনা, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তর্ক বিতর্ক চলছিল। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রহের সংজ্ঞা নির্ধারিত হলে, প্লুটো প্রধান গ্রহের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। পাশের চিত্রে প্লুটোর যে কক্ষপথ দেখানো হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, চ্যারন নামক উপগ্রহের প্রভাবে প্লুটো নিজের অক্ষ পরিত্যাগ করে ছোটো একটি চক্র তৈরি করে আবর্তিত হচ্ছে। ফলে সূর্যকে প্রদক্ষিণের জন্য একটি কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, আবার একই সাথে নিজের ক্ষুদ্র চক্রের জন্য একটি কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। প্লুটোর এই বৈশিষ্ট্যের সূত্র ধরে শুধু প্লুটো নয়, সৌরজগতের প্লুটোর মতো আরও কিছু গ্রহকে নতুন করে নাম দেওয়া হয়, বামন গ্রহ। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সৌরজগতের বামনগ্রহগুলো−এরিস, প্লুটো, হাউমেইয়া। এছাড়া আরও তিনটি গ্রহকে বামনগ্রহের তালিকায় রাখা হয়েছে। ৯০৩৭৭ সেডনা, ৯০৪৮২ অরকাস এবং ৫০০০০ কুয়াওয়ার। তবে এগুলো বামনগ্রহ কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
গ্রহাণুপুঞ্জ
মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী স্থানে গ্রহের চেয়ে ছোটো ছোটো বস্তু সূর্যকে আবর্তন করে চলেছে। এই ক্ষুদ্র বস্তুগুলোকে বলা হয় গ্রহাণু। আর সকল গ্রহাণুর সমষ্টিগত নাম গ্রহাণুপুঞ্জ। এই গ্রহাণুপুঞ্জগুলো যে কক্ষপথ ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, তাকে বলা হয় গ্রহাণুপুঞ্জ-বলয় (asteroid belt)। এই গ্রহাণুগুলোর উপাদান পৃথিবীসদৃশ গ্রহগুলোর অনুরূপ। ধারণা করা হয়, দূর-অতীতে কোনো গ্রহ ভেঙে এই গ্রহাণুগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল।
ধূমকেতু
মহাকাশে পরিভ্রমণমান এক প্রকার মহাকাশীয় বস্তু। পৃথিবী থেকে আমরা যে ধূমকেতু দেখি, সূর্য থেকে বহুদূরে পিণ্ডের আকারে থাকে। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময়, সূর্যের নিকটবর্তী হলে, এই মহাকাশীয় বস্তুর সাথে দীর্ঘ গ্যাসীয় পুচ্ছ দেখা যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে একে বলা হয় ধূমকেতু।
অন্যান্য উপকরণ
সৌরজগতের ভিতরে ভাসমান বহু ক্ষুদ্র বস্তু রয়েছে। সৌরজগত সৃষ্টির সময় এগুলো তৈরি হয়েছিল, কিম্বা সৌরজগতের বাইরে থাকে সৌরজগতে প্রবেশ করেছে। এগুলো অনেক সময় উল্কা হয়ে সূর্য এবং এর অন্যান্য সদস্যের উপর পতিত হয়।

Related Posts

5 thoughts on “রহস্যময় সৌরজগত ও আমাদের পৃথিবী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *