২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র এ্যাসাইনমেন্ট (৪র্থ সপ্তাহ)

“আসসালামু আলাইকুম ”

আশা করি সবাই ভালো আছেন। আমি ও ভালো আছি, ” আলহামদুলিল্লাহ। ”

 

 

২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র অ্যাসাইনমেন্টের (৪র্থ সপ্তাহ) একটি নমুনা উত্তর নিম্নে দেওয়া হলো।

 

 

অ্যাসাইনমেন্ট,

আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে প্রভাবিত করে বিশ্লেষণ কর।

 

 

১. মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ধারণা,
মূল্যবোধ,

মূল্যবোধ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Values। মূলত যে চিন্তা -ভাবনা, লক্ষ্য,উদ্দেশ্য ও সংকল্প মানুষের সামগ্রিক আচার-ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে,তাকেই মূল্যবোধ বলে।

এম.আর.উইলিয়াম – এর মতে “মূল্যবোধ মানুষের ইচ্ছার একটি প্রধান মানদণ্ড। এর আদর্শে মানুষের আচার-ব্যবহার ও রীতি-নীতি নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এই মানদণ্ডে সমাজে মানুষের কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা হয়।”

স্টুয়ার্ট সি.ডড -বলেন,”সামাজিক মূল্যবোধ হলো সে সব রীতি-নীতির সমষ্টি, যা ব্যাক্তি সমাজের নিকট হতে আশা করে এবং যা সমাজ ব্যক্তির নিকট হতে লাভ করে।”

 

নৈতিকতা,

নৈতিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Morality’। ইংরেজি Morality শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘Moralitas’ থেকে, যার অর্থ সঠিক আচরণ বা চরিত্র। ল্যাটিন শব্দ Mas

থেকে Morals ও Morality শব্দের উদ্ভব ঘটেছে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাই হচ্ছে নৈতিকতা।

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস,প্লেটো এবং এরিস্টটল সর্বপ্রথম নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।

 

সক্রেটিস বলেছেন, ‘সৎ গুনই জ্ঞান’। ন্যায় বোধের উৎস হচ্ছে জ্ঞান এবং অন্যায়বোধের উৎস হচ্ছে অজ্ঞতা।

 

নীতিবিদ ম্যুর বলেছেন, শুভর প্রতি অনুরাগ ও অশুভর প্রতি বিরাগই হচ্ছে নৈতিকতা।

 

 

 

২. আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের ধারণা :
আইন,

আইন হচ্ছে এমন কতগুলো,নিয়মকানুনের সমষ্টি যা সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং যা মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং যা মানুষের মঙ্গলের জন্য প্রণীত।

এরিস্টটল বলেছেন, “যুক্তিসিদ্ধ ইচ্ছার অভিব্যক্তিই হচ্ছে আইন।”

অধ্যাপক হল্যান্ড – এর মতে, ” আইন হচ্ছে, সেই সাধারন নিয়ম যা মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যা প্রয়োগ করেন।”

অধ্যাপক হল্যান্ডের মতে, আইনের উৎস ৬ টি ; যথা:

১.প্রথা, ২.ধর্ম, ৩.বিচারকের রায়, ৪.ন্যায়বিচার,

৫.বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা ও ৬.আইনসভা।

 

আইনের উৎসসমূহ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. প্রথা: প্রথা আইনের সুপ্রাচীন উৎস। প্রাচীন কাল থেকে যেসব আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি ও অভ্যাস সমাজে অধিকাংশ জনগণ কর্তৃক সমর্থিত,স্বীকৃত ও পালিত হয়ে আসছে,তাকে প্রথা বলে।কালের বিবর্তনে অনেক প্রথাই রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে আইনে রূপ নেয়।

২. ধর্ম: ধর্মীয় অনুশাসন ও ধর্মগ্রন্থ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অনেক বিধি-নিষেধ ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।ধর্মীয় বিধি – বিধানসমূহ রাষ্ট্রীয় সমর্থন লাভ করে পরে আইনে পরিণত হয়। পারিবারিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনগুলো মূলত ধর্ম থেকে এসেছে।

৩.বিচারকের রায়: বিচারকরা দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকেন। অস্পষ্ট শব্দগত ব্যাখ্যার কারণে অথবা পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষিতে বিচারকরা যখন দেশের বিরাজমান আইন দ্বারা মামলা মকদ্দমার নিষ্পত্তি করতে সমর্থন হন না, তখন তারা নিজেদের বিবেক, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা থেকে নতুন নতুন আইন সৃষ্টি করেন এবং প্রয়োজনবোধে আইনের যথার্থতা বিশ্লেষণ করেন। পরবর্তীতে এসব ‘ বিচারক প্রণীত আইন ’ অন্যান্য বিচারকগণ কর্তৃক ব্যাপকভাবে অনুসৃত হতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারপতি মার্শাল, হিউজেস প্রমুখ বিচারক এভাবে বহু নতুন আইন সৃষ্টি করেছেন।

৪. ন্যায়বিচার : আইম নিদিষ্ট ও স্থিতিশীল। কিন্তু সমাজজীবন পরিবর্তনশীল ও গতিময়। দেশ প্রচলিত আইন যখন যুগোপযোগী বিবেচিত হয় না বা পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষিতে কঠোর বা অনুপযুক্ত হয়ে ওঠে বিচারকরা তখন তাদের শুভবুদ্ধি, সচেতন বিচারবুদ্ধিমাফিক সেই আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন কিংবা নতুন আইন তৈরি করেন।বিচারকের ন্যায়বোধ থেকে এভাবে অনেক নতুন আইন প্রণীত হয়েছে।

৫. বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা : প্রখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞদের মূল্যবান ও সারগর্ভ আলোচনা বিশ্লেষণ এবং লিখিত গ্রন্থসমূহ আইনের উৎস হিসেবে কাজ করে। বিচারকরা যখন কোন বিতর্কিত জটিল বিষয়ে আইনজ্ঞদের এসব মতামত গ্রহণ করেন তখন তা প্রচলিত আইনের অঙ্গীভূত হয়ে যায়।

৬. আইনসভা : আধুনিককালে আইনের প্রধানতম উৎস হচ্ছে আইন পরিষদ। আইনসভা জনমতের সাথে সঙ্গতি রেখে আইন প্রণয়ন করে। আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে আইন পরিষদ কর্তৃক প্রণীত আইন। আইন পরিষদ শুধু নতুন আইন তৈরি করে না, পুরনো আইন সংশোধন করে তা যুগোপযোগী করে তোলে।

৭. জনমত : ওপেনহাইম, হল প্রমুখ মনীষী জনমতকে আইনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলে উল্লেখ করেছেন। আইনসভা কর্তৃক প্রণীত আইন প্রকৃতপক্ষে জনমতের অভিব্যক্তি। জনগনের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত আইনসভার সদ্যসদের প্রধান দায়িত্ব হলো জনমতের যথার্থ প্রতিফলন। আইন প্রণয়নের সময় তাই জনমতের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয়।

৮. প্রশাসনিক ঘোষণা : বর্তমানে আইন বিভাগের দায়িত্ব ও পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়ে গেছে। এই জটিলতার কারণে আইন বিভাগ তার কর্তব্য সুচারুরূপে সমাধা করতে সমর্থ হয় না। তাই আইনসভা তাী নির্বাহী কর্তৃত্বের বহুলাংশ শাসন বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে অর্পণ করে। এভাবে অর্জিত ক্ষমতাবলে জারিকৃ ঘোষণা ও আইনসমূহকে প্রশাসনিক আইন বলে।

৯. সংবিধান: সংবিধান আইনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সংবিধানের নির্দেশিত পথ ধরে আইনসভা আইন তৈরি করে।

 

স্বাধীনতা,

‘স্বাধীনতা ’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ Liberty। Liberty শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Liber থেকে এসেছে। যার অর্থ Free বা স্বাধীন।

স্বাধীনতা বলতে অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টি না করে, নিদির্ষ্ট সীমার মধ্যে থেকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করাকে বুঝায়। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী অনুকূল সামাজিক ব্যবস্থা বা পরিবেশই স্বাধীনতা। স্বাধীনতার অর্থ যা কিছু করার ক্ষমতা নয়।

হার্বার্ট স্পেনসার বলেন,” স্বাধীনতা বলতে খুশিমতো কাজ করাকে বোঝায়, যদি উক্ত কাজঅধ্যাপক হ্যারল্ড জে. লাস্কি এর মতে, “স্বাধীনতা বলতে বোঝায় সে সকল সামাজিক অবস্থার ওপর থেকে বাধা নিষেধের অপসারণ, যা আধুনিক সভ্যজগতে মানুষের সুখী জীবনযাপনের জন্য অত্যাবশ্যক।”

 

নিম্নে স্বাধীনতার বিভিন্ন রূপ দেওয়া হলো;

১. ব্যক্তি বা পৌর স্বাধীনতা।

২. প্রাকৃতিক স্বাধীনতা।

৩. আইনগত স্বাধীনতা।

৪. সামাজিক স্বাধীনতা।

৫. রাজনৈতিক স্বাধীনতা।

৬. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও

৭. জাতীয় স্বাধীনতা।

 

সাম্য,

সাম্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ Equality। সাম্যের অর্থ সমান। পৌরনীতিতে সাম্যের অর্থ হচ্ছে ‘ সুযোগ সুবিধার সমতা’। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে সমান সুযোগ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থাকে সাম্য বলে।

 

অধ্যাপক লাস্কির মতে, সাম্যের তিনটি বিশেষ দিক রয়েছে। যথা ;

১. বিশেষ সুযোগ সুবিধার অনুপস্থিত।

২. পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি এবং

৩. বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়, সম্পদ ও দ্রব্যাদি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সমভাবে বণ্টন।

 

বার্কার – এর মতে, “সাম্য কথাটির অর্থ সুযোগ সুবিধা বা অধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার পার্থক্য সৃষ্টি না করা।”

 

 

৩. আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের পারস্পরিক সম্পর্ক ও গুরুত্ব।

 

আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের পারস্পরিক সম্পর্ক ও গুরুত্ব নিম্নে আলোচনা করা হলো;

 

আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের ধারণা সংক্রান্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক বিদ্যমান। আইনহীন সমাজে যেমন স্বাধীনতা কল্পনা করা যায় না, তেমনি আইন ছাড়া সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। সাম্য ভিত্তিক সমাজ ছাড়া স্বাধীনতা উপভোগ করা যায় না।

সাম্যই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে। আবার যেখানে আইন নেই সেখানে স্বাধীনতা থাকতে পারে না। এজন্য বলা হয় আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ।

আইন না থাকলে স্বাধীনতা সংরক্ষিত হয় না।

তাই জন লক বলেছেন, ” যেখানে আইন নেই, সেখানে স্বাধীনতা থাকতে পারে না।”

আইন যেমন স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে কাজ করে। তেমনি যেখানে স্বাধীনতা নেই সেখানে আইনের প্রয়োজনীয়তা ও নেই। আবার যে সমাজের সাম্য নেই,

সেখানে স্বাধীনতা রক্ষিত হতে পারে না।

তাই অধ্যাপক লাস্কি বলেছেন, “যে রাষ্ট্রের যত সাম্য থাকবে, সে রাষ্ট্রে তত স্বাধীনতা থাকবে ।

স্বাধীনতার শর্ত পূরণ না হলে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।আবার স্বাধীনতাকে ভোগ করতে চাইলে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে দুর্বলের সাম্য সবলের সুবিধায় পরিণত হবে।

 

পরিশেষে বলা যায়, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য পরস্পরের সাথে গভীর ভাবে জড়িত। একটি থেকে অপরটিকে আলাদা করা যায় না। ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনই এই তিনের লক্ষ্য। রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে স্বাধীনতা, সাম্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে থাকে।

Related Posts

4 thoughts on “২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র এ্যাসাইনমেন্ট (৪র্থ সপ্তাহ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *