‘ সুলতান রাজিয়া ‘

“আাসসালামু আলাইকুম ”

আশা করি সবাই ভালো আছেন, আমি ও ভালো আছি “আলহামদুলিল্লাহ ”

 

আজ আমি আপনাদেরকে একজন নারীর কথা বলবো। আর তিনি হলেন ‘সুলতান রাজিয়া’। “ সুলতান ” শব্দটি পড়ে হয়তো-বা আপনারা ভাবছেন আমি হয়তো ভুলবশত ‘ সুলতান’ লিখেছি। কিন্তু এমনটা না। আমি কেন ‘সুলতানার’ বদলে ‘ সুলতান ‘ লিখলাম তা কিছুক্ষন পর জানাচ্ছি।

 

প্রথমে ‘ সুলতান রাজিয়া ‘ সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া যাক।

দিল্লি সালতানাত এর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ‘শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ’ এর কন্যা ছিলেন ‘ সুলতান রাজিয়া ‘।

‘সুলতান রাজিয়া’ হলেন ভারতের মুসলিম শাসনের ইতিহাসে পথম ও একমাত্র মহিলা সুলতান। ছোট থেকেই অস্ত্র শিক্ষা থেকে শুরু করে ঘোঁড়সওয়ারি। যুদ্ধবিদ্যা সব কিছুতেই তিনি পটু ছিলেন। সুলতান ইলতুৎমিশ মেয়ের এসবের প্রতি আগ্রহ দেখে তিনি রাজিয়াকে নিজের মতো করে শেখার সুযোগ দেন।রাজিয়া প্রশাসক, সুদক্ষ যোদ্ধা, সেনাপতি ছিলেন। তাছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে একজন দক্ষ সৈনিক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল।

সুলতান ইলতুৎমিশ এর জীবদ্দশায় তার সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসির উদ্দীন পরলোক গমন করেন। সুলতানের দ্বিতীয় পুত্র রুকনউদ্দিন ফিরোজ ছিলেন অযোগ্য ও অকর্মন্য আর অন্য পুত্রগণ ছিলেন অপরিণত বয়স্ক। তাই মৃত্যু শয্যায় ইলতুৎমিশ তার সুচতুর ও বুদ্ধিমতি কন্যা রাজিয়াকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারিণী মনোনীত করেন। কিন্তু অভিজাতবর্গ একজন নারীর শাসন মানতে অস্বীকার করে। ফলে রাজিয়ার পরিবর্তে রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসানো হয়।

অযোগ্য শাসক ফিরোজের কুশাসনে সাম্রাজ্যে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে অযোধ্যা, বাদায়ূন,হানসী এবং মুলতানের শাসনকর্তা রাজিয়াকে সমথর্ন করেন।এদের সহযোগিতা নিয়ে রাজিয়া রুকনউদ্দিন ফিরোজকে অপসারণ করতে সক্ষম হন।

রাজিয়া ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন।

 

এখন আসি রাজিয়া মেয়ে হওয়ার সত্ত্বেও তাকে ‘সুলতানা ‘ না বলে ‘ সুলতান ‘ বলার কারণ কি।

সুলতানা শব্দের অর্থ হচ্ছে – রাণী, সুলতানের স্ত্রী। সুলতান রাজিয়া কোন সুলতানের স্ত্রী ছিলেন না বরং তিনি সিংহাসনে আরোহন এবং সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন।

সুলতান হচ্ছে শাসকদের পদবি। আর রাজিয়া দিল্লি সালতানাতের একজন শাসক ছিলেন। তাই রাজিয়াকে ‘সুলতানা রাজিয়ার ‘ বদলে ‘ সুলতান রাজিয়া ‘ বলা হয়।তাছাড়া তিনি নিজেকে‘ সুলতানা ‘ সম্বোধন করাটা পছন্দ করতেন না।কারণ তিনিতো শাসকের স্ত্রী নন, বরং তিনিই স্বয়ং শাসক। রাজিয়া তার শাসনামলে তার নামেই মুদ্রা প্রচলন করে যার মধ্যে লিখা ছিল – রাজিয়া, আল – সুলতান আাল – মোয়াজ্জেম যার অর্থ হলো রাজিয়া, মহান সুলতান।

আশা করি সবাই বুঝতে পেরেছেন তাকে ‘ সুলতান রাজিয়া ‘ ডাকা হয় কেন।

 

‘ সুলতান রাজিয়ার ‘ রাজত্ব কাল ছিল ১২৩৬ – ১২৪০ পর্যন্ত। তিনি সম্ভবত ৪ বা ৪ বছরের একটু বেশি সময় রাজত্ব করেন।

 

 

রাজিয়ার শাসন ব্যবস্থা:

 

ক্ষমতা লাভ করে ‘ সুলতান রাজিয়া ‘ পর্দাপ্রথা বর্জন করে পুরুষের পোশাক পরিধান করে প্রকাশ্যে রাজদরবারে বসে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।শুধু তাই নয়, তিনি খুব সাহসী ছিলেন। যোদ্ধার পোশাকে সজ্জিত হয়ে অশ্বারোহণ করে রণক্ষেত্রে নিজে যুদ্ধ করতেন।তওনি স্বয়ং হিন্দু ও মুসলিম বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান করেন।

 

 

‘ সুলতান রাজিয়ার ‘ মৃত্যু :

 

পাঞ্জাবের শাসনকর্তা কবির খান রাজিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের তুললে রাজিয়া তাকে দমন করেন। ইতিমধ্যে ভাতিন্দার শাসনকর্তা আলতুনিয়া বিদ্রোহী হয়ে উঠলে রাজিয়া সসৈন্য আলতুনিয়ার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। কিন্তু রাজিয়া পরাজিত হন এবং আলতুনিয়ার হাতে বন্দী হন। এ সুযোগ নিয়ে দিল্লির অভিজাতবর্গ মুইজউদ্দিন বাহরামকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজিয়া সম্ভাবত ধংসের হাত থেকে রাজ্যকে রক্ষার জন্য কৌশল ও কূটবুদ্ধির সাহায্যে আলতুনিয়াকে বিয়ে করেন।ফলে দুজনে মিলে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার জন্য অগ্রসর হন। কিন্তু ১২৪০ খ্রিষ্টাবদে মুইজউদ্দিন বাহরামের কাছে পরাজিত হন এবং পলায়ন করেন। পলায়নের সময় হিন্দু আততায়ীর ( আততায়ী অর্থ বিশ্বাস ঘাতক) হাতে পড়ে তারা উভয়ই নিহত হন। আর রাজিয়ার শাসনের অবসান হয়।

 

 

 

রাজিয়ার পতনের কারণ :

 

প্রথম কারণই হলো তিনি একজন নারী ছিলেন। একজন শাসকের যেসব গুণ থাকা আবশ্যক সেসব গুণ রাজিয়ার মধ্যে ছিল, কিন্তু একজন নারী ছিলেন বলে তিনি শাসন হিসেবে ব্যর্থ হন। আর এই ব্যর্থতাই তার পতনের জন্য দায়ী।

ভি. ডি. মহাজন বলেন,‘ মনে করা হয়ে থাকে যে,যদি রাজিয়া একজন মহিলা না হতেন তাহলে তিনি ভারতের অন্যতম সফলকাম শাসক হতে পারতেন।তার বড় দুর্বলতা ছিল যে,তিনি ছিলেন একজন নারী।’ নারী ছিলেন বলেন তার পতন ঘটেছিল।

 

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে রাজিয়া পুরুষের পোশাক পরে প্রকাশ্যে দরবারের রাজকার্য পরিচালনা এবং অশ্বপৃষ্ঠে আরোহন করে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করায় গোঁড়া মুসলমানরা তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

 

তৃতীয়ত হাবসী অনুচর ইয়াকুতের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ও উচ্চপদে নিযুক্ত অভিজাত ও আমিরদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করছিল।

 

 

 

তিনিই একমাত্র মুসলিম নারী যিনি দিল্লির সিংহাসন অলংকৃত করেন। তিনি তার শাসনকালে নারী হয়েও অসাধারণ শাসন প্রতিভা,কূটনৈতিক প্রঞ্জা এবং রাজকীয় অন্যান্য গুণাবলির পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নির্ভীক, উৎসাহী, সুদক্ষ যোদ্ধা ও সেনাপতি। তিনি ভারতে তুর্কি শাসনের গৌরব পুনরুদ্ধার এবং আমির ও মালিকগণের উপর সাময়িকভাবে হলেও স্বীয় প্রভুত্ব কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিলেন।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে রাজার প্রয়োজনীয় গুণাবলির অধিকারীণী হওয়া স্বত্বেও পুরুষের চিরাচরিত ধারণা অনুযায়ী তার ঐসব গুণ মুল্যহীন।

Related Posts

3 thoughts on “‘ সুলতান রাজিয়া ‘

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *