misconception about qurbani

কুরবানীর প্রচলিত ১০টি ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

ধর্মের অনেক রীতি-নীতি আমাদের পালন করতে হয়। কিন্তু ধর্ম পালন করতে গিয়ে অজ্ঞতা এবং সামাজিকতার কারণে অনেক রকম কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত হয়ে যায় । ঠিক একইভাবে কুরবানী নিয়েও আমাদের বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। আর এসব কারণে ধর্মের মূল নীতি অনেকে বুঝতে পারে না।  কুরবানী বিত্তবানদের জন্য আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্ঠি অর্জনের  অন্যতম একটা উপায়। আজকে কোরবানী নিয়ে সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেশকিছু কুংস্কার নিয়েই আজ আলোচনা করবো। তো চলুন আর দেরি না করে জেনে নেই কোরবানী নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার।

১. যিলহজ্জ মাসের পর থেকে কুরবানী না করা পযর্ন্ত চুল, চামড়া ও নোখ কাটা থেকে বিরত থাকা।

এই ধারণাটা একইসাথে ভুল এবং সঠিক। যে ব্যক্তি কোরবানী করার নিয়ত করে তার জন্য চুল, চামড়া ও নখ কাটা উচিত না। কিন্তু যে ব্যক্তির কোরবানীর নিয়ত নাই তার জন্য সমস্যা হবে না। এসম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “যখন (যিল হজ্জ মাসের) দশক শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল, চামড়া ও নোখের কোনো কিছু না কাটে”। [মুসলিম, আযাহী অধ্যায়, নং ১৯৭৭]

২.  কুরবানীর সময় শুধু ১০ম যিল হজ্জকে মনে করাঃ

কুরবানীর সময় ১০ম যিল হজ্জে ঈদের নামায সমাপ্ত হলে শুরু হয় এবং তাশরীকের শেষ দিন অর্থাৎ ১৩ ই যিল হজ্জের সূর্যাস্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। যদিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১০ম তারিখেই কুরবানী করতেন কিন্তু তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এও বলেছেনঃ “এবং তাশরীকের সমস্ত দিন কুরবানীর দিন”। [আহমদ, স্বহীহুল জামি, আলবানী নং ৪৫৩৭]

তাই কোনো ব্যক্তি যদি ১০ম যিল হজ্জে কোনো কারণে কুরবানী না করতে পারে তাহলে, তাশরীকের যে কোনো দিনে কুরবানী করতে পারে।

৩. অমুসলিমকে কুরবানীর গোশত দেওয়া অবৈধ বা অপছন্দ মনে করাঃ

অমুসলিমকে তার অভাবের কারণে, প্রতিবেশী হওয়ার কারণে এমনকি তার মন জয় করার উদ্দেশ্যে তাকে কুরবানীর গোশত দান করা বা সাদাকা করা বৈধ। ‍হ্যাঁ, তবে সে যদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হয়, তাহলে তার বিধান ভিন্ন। [সউদী স্থায়ী উলামা পরিষদের ফতোয়া ১১/৪২৪]

৪. জেনে-বুঝে দোষ যুক্ত পশু ক্রয় করাঃ

চার প্রকার দোষ ওয়ালা পশুর কুরবানী বৈধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “ চার প্রকার (দোষ থাকলে) কুরবানীতে বৈধ নয় –অন্য বর্ণনার শব্দে এসেছে যথেষ্ট নয় – স্পষ্ট টেরা, স্পষ্ট রোগা, স্পষ্ট খোঁড়া, অতি দুর্বল (অতি বয়সের কারণে মজ্জাহীন হাড় ওয়ালা) [আবু দাঊদ নং ২৮০২, তিরমিযী নং ১৪৯৭, নাসাঈ ৪৩৬৯]

এই দলীলের আলোকে এটাও বুঝা যায় যে, যেই পশুর দোষ এর থেকেও বেশী ও বড় সেসব পশুর কুরবানীও নাজায়েয। যেমন অন্ধ, পা ভাঙ্গা, চলতে অক্ষম ইত্যাদি। উপরোক্ত দলীলের আলোকে এটাও বুঝা যায় যে, বর্ণিত দোষ থেকে নিম্ন পর্যায়ের দোষ থাকলে তার কুরবানী বৈধ কিন্তু উত্তম নয়। যেমন কান কাটা, শিং ভাঙ্গা, লেজ কাটা, চামড়া কাটা পশু। এমন দোষ থাকলে তা কুরবানীতে মাকরূহ।এর পরেও অনেককে দেখা যায়, কিছু মানুষ স্পষ্ট খোঁড়া বা একেবারে বয়স্ক পশু কুরবানীর জন্য খরীদ করে!

৫. কুরবানীর চামড়া বিক্রয় করাঃ

উল্লেখ্য যে, কুরবানীর পশুর সব কিছুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তাই তার কোনো অংশ বিক্রয় নিষেধ। যেমন তার গোশত বিক্রয় নিষেধ তেমন তার চামড়া বিক্রি করাও নিষেধ।  আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা কুরবানীর উটের দায়িত্ব দেন এবং আদেশ করেন, যেন আমি সেই উটের গোশত, চামড়া, পরিধেয়, সাদাকা/দান করে দেই এবং কশাইকে তা থেকে কিছু না দেই”। [মুসলিম নং ১৩১৭]

৬. আমাদের দেশের অনেক এলাকাতেই কুরবানীর পশুর খাদ্য নালী নিয়ে ঘরের সামনে টাঙ্গিয়ে দেয়। তারা মনে করে এর মধ্যে অনেক সাওয়াব রয়েছে। এটি একটি অবান্তর ধারণা। 

৭. আবার কোন কোন এলাকায় প্রচলিত আছে, যে সমস্ত আমের গাছে পোকা হয় সেই সমস্ত গাছে  কুরবানীর পশুর হারগুলো গাছে ঝুলিয়ে রাখলে পোকা হয় না অথচ এই ধরনের ধারণা  ভিত্তিহীন এবং সম্পন্ন কুসংস্কার।

৮. দেশের অনেক এলাকাতে জিলহজ্ব মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকে কুরবানীর দিন পর্যন্ত মুরগি ও অন্যান্য প্রাণী এবং খাদ্যবস্তু না খাওয়ার যে রেওয়াজ রয়েছে তা শরীয়তে ভিত্তিহীন। 

৯. অনেক এলাকায় পশুর বয়স অনুপাতে দাঁত গজিয়েছে কিনা তা যাচাই করা হয়। কিন্তু বয়সের ক্ষেত্রে দাঁত গজানো না গজানোর উপর নির্ভর করা যায় না। বরং বয়সের সঠিক ধারণা হচ্ছে; দাঁত না গজালে কুরবানী হবে। আর বয়স কম হলে দাতঁ গজালেও কুরবানী হবে না।  

১০. পশু ক্রয় করার পরে লালসালু দিয়ে সাজসজ্জা করা, ফুলের মালা দিয়ে অলিতে-গলিতে নিয়ে যাওয়া এবং মানুষের বাহবা পাওয়ার জন্য কুরবানীর পশুকে এদিক সেদিক বিভিন্ন দিকে ঘোরানো সম্পূর্ণ নাজায়েয।

ঈদুল আযহার দিনে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারঃ

১. গোস্ত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি দেওয়া।

২. কয়েকজন ভাগের কুরবানীতে একজনের নিয়তে যদি সমস্যা থাকে তবে বাকিদের কুরবানী হবে না।

৩. পশুর ওজন পরিমাপ করে প্রতি কেজি মূল্য নির্ধারণ করা। তবে খেয়াল রাখবেন, গরু মহিষ দুই বছরের কম হলে কুরবানী হবে না। আবার ছাগল এক বছরের কম হলে কুরবানী হবে না। 

৪. কুরবানী পশু কম দামে কিনে বেশি দামে বলা, বেশি দামে কিনে কম দামে বলা। 

৫. লোক দেখানো নিয়তে ফেসবুকে কোরবানির পশুর ছবি দেয়া

৬. সন্তান নিজে নিসাবের বা সম্পদের মালিক। নিজে কুরবানী না করে বাবা-মার পক্ষ থেকে কুরবানী করা। যদি বাবা-মা নিসাবের মালিক না হন তবে সন্তানের উচিত নিজের ওয়াজিব কুরবানী করা এবং অতিরিক্ত হিস্যা বা অংশ থাকলে তাকে মা-বাবার জন্য সাওয়াবের নিয়তে মা-বাবার নাম দিতে পারে। এতে কোনো প্রকার সমস্যা হবে না। 

এছাড়াও কুরবানীর সাথে আকিকা করা যাবে না বলে মনে করা। যদিও এ ব্যাপারে অনেক মতভেদ আছে। গরুতে সাত ভাগ করা যাবে না। মৃতদের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া যাবে না। কোটিপটি হলেও কুরবানী না করলে সমস্যা হবে না। 

শেষকথা

আল্রাহ আমাদের সঠিকভাবে কুরবানী দেওয়ার তৌফিক দান করুক। কুরবানী শুধু খাওয়ার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্ঠি অর্জনের জন্য। কিন্তু আজকাল কুরবানীর মাহাত্ন্যে ভুল বসেছি। তাই কুরবানী নিয়ে বিভিন্ন প্রকার কুসংস্কার ও ভুল ধারণা আমাদের মনে বাসা বেঁধে থাকে। সবধরনের কুসংস্কার কে ভেঙ্গে দিয়ে ইসলামকে সঠিক মানার চেষ্টা করি ও কুরবানীর ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্ঠি অর্জনের পথ সুগম করি। 

Related Posts

5 thoughts on “কুরবানীর প্রচলিত ১০টি ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *