অসুস্থতার জন্য এবারের ঈদ টা হাসপাতালের গন্ডিতেই পার করেছি।
মা চলে যাবার পর বছর সাতেক বাবা বেশ সুস্থ ছিল অথছ আমি দেখেছি বাবাই নিয়ম করে বেশ অসুস্থ থাকতো কিন্তু বাবার আগেই মা পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে।
খুব বেশি আত্মীয় কোনোদিনই ছিলো না আমাদের। বাবা-মায়ের ভালোবাসার বিয়ে তাই জন্যই হয়তো আমাদের কেউ মেনে নেয়নি।

তবে মা থাকাকালীন দিদা মানে মায়ের মা মাঝেমধ্যে খোঁজ খবর নিতো।

এখন সেও আর নেয়না।

বাবার ছোট্ট সংসারে মা সারাজীবন নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিল।এ নিয়ে বাবার প্রতি মায়ের কোনো অভিযোগ ছিলো না কস্মিনকালেও।

খুব বেশি বিলাসিতায় বড় না হলেও যখন যেটা প্রয়োজন বা চাহিদার তালিকায় থাকতো বাবা তা মিটিয়েছেন খুব নিখুঁতভাবে।

যাক সে কথা পুরোনো দিনের কথা আগলে রাখার চেয়ে উগড়ে ফেলায় ভালো।

দিনদিন বাবা যেভাবে অসুস্থ হচ্ছে এতেকরে না জানি অফিস শেষে হাসপাতালে ফিরে বাবাকে নাও পেতেও পারি।

হসপিটালের ডাক্তার নার্সগুলোও ছুটি শেষে ফিরতে শুরু করেছে।

প্রায় আড়াই মাস একটানা হসপিটালের বেডে শুয়ে অাছেন বাবা শুকিয়ে গেছে কতটা, দেখলেও কষ্ট লাগে।

মাসখানেক রান্না করে নিয়ে আসতাম অফিস শেষে এখন আর তা প্রয়োজন হয় না।রোজ রোজ অফিস শেষে রান্না করে হসপিটাল দৌড়াতে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।তবে এখন যে বাবা খাওয়াটাও ছেড়ে দিয়েছে। অাজকের রাতটা কাটলেই কালকে থেকে আবারো কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরতে হবে।ঈদ উপলক্ষে ছুটি ছিলো বলে সপ্তাহখানেক বাবাকে ছেড়ে বের হইনি প্রয়োজন বিহীন।

এদিকে বাবার জমানো টাকা গুলো শেষ হয়েছে মাস চারেক।
এখন আমার চাকরি সূত্রে পাওয়া কিছু টাকা দিয়েই চিকিৎসা চালাচ্ছি

আগের ডাক্তার যিনি ছিলেন তিনি শুনেছি অন্য কোথাও বদলি হবেন ঈদের
পর আর তার বদলে আসবে অন্য ডাক্তার।

সকাল সকাল বাসায় গিয়ে হালকা কিছু রান্না করে খেয়ে অফিসে গেলাম।তবে কেন জানি মনটা কাজে বসাতে পারছি না।বেশ কয়েকবার হসপিটালে ফোন করে খোজ ও নিয়েছি।আগের মতোই আছে বাবা।অনেকদিন এসব থেকে দূরে ছিলাম তো।অফিস শেষ করে বাসায় ফিরে বাবার পছন্দের দুটো রান্না করে বাবাকে খাওয়াবো বলে এত্তো তড়িঘড়ি করে চলে এসেছি।

হসপিটালে গিয়ে বাবার অবস্থা দেখে বেশ চিন্তিত লাগছিলো কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই।তাই রান্নাকরা খাবারগুলো পাশের বেডে থাকা আন্টিকে দিয়েছি।
নতুন ডাক্তার তো আসার কথা এ কয়েকদিন খুব বেশি ডাক্তার ছিলো না হাসপাতালে আসলে সবাই তো চায় প্রিয়মানুষের সাথে কিছু স্মৃতিময় মুহূর্ত কাটাতে বিশেষদিনে।
বাবার পরিস্থিতি দেখে ডাক্তারের রুমে ডাকতে গিয়ে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম নতুন আসা ডাক্তারকে তো আমি চিনি।

মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে যে চোখ দুটো আছে তা আমার বেশ চেনা
পুরো তিনটে বছর ও চোখে রোজ স্বপ্ন বুনতাম অথচ সময় আর ভাগ্যে আমাকে ও চোখের অগোচরে হারিয়ে ফেলেছে অনেক বছর আগেই।

নিরবতা কাটিয়ে তার মুখের বুলি ফুটছে হাজারো অদেখা কথা এড়িয়ে গিয়েছে মনে।
না আজ আর পুরোনো কথা নয় একজন ডাক্তার আর রোগীর মেয়ে হিসেবেই ফর্মালিটি পূরণ করেছি।

সে বেশ অবাক হয়েছে।
আমার বাবার অসুস্থতার খবর শুনে।
তবুও তাকে আগের অনয়ের সাথে মেলানোর বৃথা চেষ্টা করিনি আমি।

যে অনয় পিহুক নামে মত্ত ছিলো সে নামটা শুধু স্মৃতির পাতায় উঁকি দেয়া ছাড়া আর বিশেষ কাজ নেই তার।

এ ঘটনার চারদিন পর বাবাও আমাকে ছেড়ে চলে যায় আসলে সময় বেশ ঘনিয়ে এসেছিলো তাই আটকাতে পারিনি।আসলে আমি আমার জীবনে কাউকেই কোনোদিন আটকাতেকে পারেনি না মা কে!
না অন্যকে না বাবাকে।
যদিও বিধাতা আমাকে নতুন করে কষ্ট দেওয়ার ফন্দি এটেছে।

তবুও আমি সব কিছু কাটিয়ে উঠবো।বাবা চলে যাবার খবর পেয়ে যখন হসপিটালে আসলাম তখন বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টলমলে চোখে একজন ডাক্তারকে দেখছি।বাবাকে আকড়ে বেঁচে ছিলাম এতোদিন।মা চলে গিয়ে যতটা একা করে দিয়েছিলো তারচেয়ে বেশি একা এখন আমি।

বাবার শেষকৃত্য করার আগে হসপিটালের নিয়ম কানুন যখন শেষ হচ্ছিল তখন আশেপাশের থাকা মানুষগুলো বেশ কানাঘুষা করছিলো নতুন ডাক্তারকে নিয়ে কেননা সে এই ৫দিনে খুব বেশি করেছে আমাদের জন্য এমনকি সারারাত জেগেছে তার ডিউটি না থাকাকালীন সময়েও সময় দিয়েছে বাবার জন্য।জানি না কেন সে এতটা সদয় হয়েছে আমার উপর অথবা বাবার প্রতি।যাই হোক বাবা তো আর বেঁচে নেই এসব কথা ভেবে আমি আর তাকে সম্পর্কে বাধবো না বরং আমি কৃতজ্ঞ তার কাছে সে যথেষ্ট করেছে আমাদের জন্য।

শেষকৃত্য করে বাসায় যাবো কি না যাবো ভাবছি পুরো রাত চোখের জল পড়েছে তবে কোনো আহাজারি ছাড়া অথচ পাশের মানুষটাও চুপচাপ আছে আমার সাথে।

বাবাকে রেখে বাসায় যেতে মন চাচ্ছে না।এখানে আগেও একবার এসেছিলাম আমি মা কে রেখে যেতে আজকে আবারো এসেছি বাবাকে রেখে যেতে কিন্তু সেদিন বাবার হাত ধরে ফিরেছিলাম বাসায় অথচ আজ বাসায় ফেরার জন্য একটা বিশ্বাস যোগ্য হাত নেই নতুবা আমার হাতটা অপয়া যাকে ধরবো সে অধরা হয়ে যাবে চিরকালে জন্য।

পাশে থাকা মানুষটাকে এবার আমি নিজেই ফাঁকি দিবো।

রাত ফুরাবার আগেই এ চিরচেনা শহর ছাড়তে হবে,কিছু মায়া কাটাতে হবে।
যে প্রায় ১০বছর আমায় ছাড়া ছিলো জীবনের বাকি দিনগুলোও আমাকে ছাড়াই বেশ কাটাতে পারবে।
এবার আমিই তাকে ফাঁকি দিবো জীবনের যত ফাঁক ফোঁকর ছিলো সেখানে ফিরিয়ে দেবো তাকে। এই সব ভাবতেছি আর দুচোখ থেকে অঝোর অশ্রু ঝরতেছে।দেখার কেউ নেই। মা গেলো, বাবা গেলো।দুনিয়ায় আপন যদি কেউ থাকে তা হলো বাবা মা।আর,তারা দুজনই ফাকি দিলো।কার কাছে যাবো আমি।বাবা মায়ের সম্পর্কের বিয়ে ফলে,আমার কাছের আর কোন মানুষ ও নেই যারা আমাকে একটু সান্তনা দিবে।কোন কিছু ভালো লাগে না। কি করব?কিভাবে বেঁচে থাকবো?কাকে বাবা বলে ডাকবো আমি!কেউ তো আমাকে বোঝার মতো রইলো না।

Related Posts

26 thoughts on “আমি নিজেই ফাকি দিব।

  1. প্লিজ সবাই কমেন্ট করেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *